Channel786 is a Community News Network

শ্রাবণী সিং: আফসোস হয়, কেন আরও আগে সত্যের সন্ধান পাইনি

সাইদ রহমান

প্রকাশিত: ০০:৫১, ৬ জুন ২০২২

আপডেট: ০০:৫৬, ৬ জুন ২০২২

শ্রাবণী সিং: আফসোস হয়, কেন আরও আগে সত্যের সন্ধান পাইনি

চ্যানেল ৭৮৬ এর জনপ্রিয় শো ‘এটর্নি রাজু মহাজন প্রেজেন্টস এনআরবি আইকন’। প্রতি সপ্তাহে একজন আইকনিক ব্যক্তিত্বকে হাজির করা হয় এই অনুষ্ঠানে। উপস্থাপনায় থাকেন জাহান অরন্য। এবারের পর্বের অতিথি সিপিএ শ্রাবণী সিং। তিনি তার জীবন, বিশেষকরে সম্প্রতি ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার গল্প বলেছেন-

জাহান অরন্য: আপনার পরিচয়টা প্রথমে আপনার কাছেই শুনতে চাই
শ্রাবণী সিং:
আমি একজন সার্টিফাইড পাবলিক অ্যাকাউন্টেন্ট, সিপিএ। আমার জন্ম চট্টগ্রামে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে থাকি। একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত হওয়ায় ওটাই আসলে আমার শেকড়। যখনই সুযোগ পাই, সাধ্য অনুযায়ী বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য কিছু করার চেষ্টা করি। আমাকে এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য ধন্যবাদ। তবে আমি কিন্তু কোনো আইকনিক ব্যক্তিত্ব নই।

জাহান অরন্য: আমেরিকায় কখন আসলেন এবং কীভাবে?
শ্রাবণী সিং:
১৯৯৯ সালে আমি আমার বাবা-মার সঙ্গে আমেরিকাতে আসি। তখন গ্রিন কার্ড নিয়েই এসেছিলাম। মূলত পড়াশোনার জন্য এই দেশে আসা। এখানে আসার পর টেক্সাসের আর্লিংটনে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস থেকে গ্রাজুয়েশন করেছি। তারপর মাস্টার্স করেছি একাউন্টিংয়ে। 

জাহান অরন্য: ক্যারিয়ার শুরু করলেন কখন?
শ্রাবণী সিং:
মাস্টার্স শেষ করার পরেই আমি সার্টিফাইড পাবলিক অ্যাকাউন্টেন্ট হিসেবে পরীক্ষা দিয়েছি। ওই সময়টা ছিল আমার জীবনের কঠিন একটা সময়। তারপরও চারবারের পরীক্ষায় এক চান্সে পাস করেছি। কোভিড চলাকালে স্মল বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের একজন ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টেন্ট হিসেবে কাজ করেছি। এছাড়া নিউইয়র্ক-কানেকটিকাট বেজড একটি ব্যবসা আছে আমার, সেটা দেখাশোনা করি।

জাহান অরন্য: আপনার পরিবার সম্পর্কে জানতে চাই।
শ্রাবণী সিং:
আমার বাবা বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত ব্যবসায়ী। মা দীর্ঘদিন ধরে স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। আমার একমাত্র ভাই একজন ডাক্তার, লন্ডনে থাকেন। এছাড়া আমার তিনটি বোন আছে। তারা সবাই ওয়েল এস্টাবলিশড এবং বিবাহিত জীবনে সুখী।

জাহান অরন্য: আপনার এই অর্জনে পরিবারের ভূমিকা কতটা?
শ্রাবণী সিং:
ক্যারিয়ারে আমি কী করেছি বা করছি, সেটা নিয়ে বলার মতো আমার তেমন কিছু নেই। তবে আমার পরিবারের কাছে সবচেয়ে বড় যে জিনিশটা পেয়েছি, সেটা হলো চিন্তা করার ক্ষমতা। আমার বাবা-মা অত্যন্ত লিবারাল। একটা সেকুলার পরিবেশে আমরা ভাইবোনরা বেড়ে উঠেছি। সেখানে বই ছিল, একটা পড়াশোনার আবহ ছিল। তাই আমরা সবাই একেকজন মুক্তচিন্তার মানুষ হিসেবে গড়ে উঠেছি।

জাহান অরন্য: ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত কখন নিলেন?
শ্রাবণী সিং:
একটু আগেই বললাম, ছোটবেলা থেকেই আসলে আমাদের পরিবারে আমরা একটি ওপেন কালচারে বড় হয়েছি। সেখানে হিন্দু পণ্ডিতদের লেখা যেমন পড়েছি, পড়েছি মুসলিম পণ্ডিতদের কথা। স্বল্প হলেও একটা আন্তধর্মীয় কালচারের মধ্যে আমরা ছিলাম। তাই ধর্ম হিসেবে ইসলামকে একটু-আধটু জানার সুযোগ আমার হয়েছে।

জাহান অরন্য: আমেরিকায় এসে ইসলামের প্রতি আগ্রহ তৈরি হলো কীভাবে?
শ্রাবণী সিং:
এখানে আমার বন্ধু-বান্ধবীদের অনেকেই মুসলমান। আমি দীর্ঘদিন ধরেই তাদের সঙ্গে মিশছি। তারা কীভাবে ইসলামের রিচুয়ালগুলো পালন করে, সেটা দেখতাম। এভাবেই ইসলামের প্রতি একটা ভালোলাগা তৈরি হয়। এরপর ইসলাম সম্পর্কে আরও ভালোভাবে পড়তে শুরু করলাম। যত জানলাম, ততই আমার আগ্রহ বাড়তে লাগলো। এক সময় সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করবো।

জাহান অরন্য: ইসলামের কোন বিষয়গুলো আপনাকে বেশি আকৃষ্ট করেছে?
শ্রাবণী সিং:
মুসলমানদের মধ্যে একটা স্ট্রং ইউনিটি আছে। একজন বাংলাদেশি মুসলমান যেভাবে নামাজ-রোজা করছেন, সুদূর নাইজেরিয়াতে একজন মুসলমান সেভাবেই নামাজ-রোজা করছেন। এটা আমার বেশ ভালো লাগে। আরেকটা বিষয় হলো, ডিসিপ্লিন। দিনে পাঁচবার সময়মতো নামাজ পড়া, তার জন্য ওজু করা- সবকিছুর মধ্যে দারুণ একটা শৃঙ্খলা।

জাহান অরন্য: ইসলাম গ্রহণে আপনাকে কেউ প্রভাবিত করেছে?
শ্রাবণী সিং:
না, কেউ আমাকে প্রভাবিত করেনি। তবে হ্যাঁ, ইসলামের সৌন্দর্য আমাকে প্রভাবিত করেছে। দেখুন, আজকাল কেউ ধর্মান্তরিক হলেই অনেকে বলতে শুরু করে, ব্রেইন ওয়াশ করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে আমার বক্তব্য হলো- আমি একজন সফল নারী, একজন চার্টার্ড একাউন্টেন্ট, সর্বোচ্চ পর্যায়ে পড়াশোনা করেছি, দীর্ঘদিন আমেরিকায় থাকি। আমাকে কীভাবে একজন মানুষ ব্রেইন ওয়াশ করবে? বিশ্বাস এমন একটা জিনিস যেটা কোনো শিক্ষিক-সচেতন ব্যক্তির ওপর অন্য কেউ চাপিয়ে দিতে পারে না।

জাহান অরন্য: আপনার সন্তানও তো আপনার সঙ্গে ধর্মান্তরিত হয়েছে?
শ্রাবণী সিং:
হ্যাঁ। আমি চাই এ ব্যাপারে আমার সন্তান আরও জানুক। সে যে একটা শ্রেষ্ঠ ধর্মে দীক্ষিত হয়েছে, সেটা উপলব্ধি করুক। একটা সন্তান কিন্তু পৃথিবীতে কোনো ধর্ম নিয়ে আসে না। বাবা-মা যে ধর্মে থাকে, সন্তানও সেই ধর্মের ছায়ায় বড় হয়। তাহলে আমি যে সত্যের সন্ধান পেলাম, সেটার সন্ধান আমার সন্তানকে দেব না কেন? কিন্তু আমি কোনো কিছুই চাপিয়ে দিতে চাই না। আমার সন্তানকে আমি স্বাধীনতা দিয়েছি।

জাহান অরন্য: এখন আপনি কীভাবে ধর্মচর্চা করছেন? 
শ্রাবণী সিং:
একজন নও মুসলিমের পক্ষে যতটুকু সম্ভব, ততটুকুই করছি। আপনারা যারা জন্ম থেকেই মুসলমান তারা ছোটবেলা থেকেই কোরআন শরীফ পড়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু আমরা যারা কনভার্টেড, তাদের জন্য বিষয়টা কঠিন। আমাদের সামনে সবকিছুই নতুন। তাই একটু কঠিন হওয়াটা স্বাভাবিক। তারপরও আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি। ইউটিউব দেখে নামাজ আদায় করার চেষ্টা করি।

জাহান অরন্য: ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে যদি খুব সংক্ষেপে কিছু বলেন?
শ্রাবণী সিং:
ইসলামের বিরুদ্ধে অনেকে ভায়োলেন্স ছড়ানোর অভিযোগ আনে। এটা আসলে অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছু নয়। কোন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে কোরআন-হাদিসে কী বলা হয়েছে, তা বিস্তারিত পড়লে অবশ্যই অভিযোগকারীদের ভুল ভেঙে যাবে। আমি মনে করি, ইসলাম খুবই যৌক্তিক এবং খুব সুন্দর একটা ধর্ম। এখন আমার খুব আফসোস হয়, কেন জীবনের বড় একটা সময় অন্ধকারে কাটলো!

জাহান অরন্য: আপনার নাম এখনো শ্রাবণী সিং, এটা পরিবর্তন করবেন না?
শ্রাবণী সিং:
যে ইমামের কাছে আমি শাহাদাহ গ্রহণ করেছি, তার সঙ্গে এটা নিয়ে আলাপ হয়েছে। তিনি আমাকে বলেছেন, এটা নিয়ে তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই। আমিও এ ব্যাপারে প্র্যাকটিক্যাল ওয়েতে আগাতে চাই। একজন মুসলমানকে বিয়ে করে নাম পরিবর্তন করতে চাই। আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন।

সংবাদটি শেয়ার করুনঃ