Channel786 is a Community News Network

দেরিতে হলেও গুজব কিন্তু ছড়াচ্ছে

জাকির জাহিদ

প্রকাশিত: ১৫:৫৬, ১ আগস্ট ২০২১

দেরিতে হলেও গুজব কিন্তু ছড়াচ্ছে

২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যে ১০১ বছর বয়সী এক দাদি তাঁর নাতনির দুই সপ্তাহ বয়সী মেয়েকে কোলে নিয়ে ছবি তুলেছিলেন। রোজা ক্যামফিল্ড নামের ওই নারী ওই বছরের ৩০ মার্চ মারা যান। রেখে যাওয়া ছবিটি পশ্চিমা বিশ্বের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ভাইরাল হয়। নেটিজেনরা মানবিক আবেদন খুঁজে পান ওই ছবিতে।
এর কিছুদিন পর ওই ছবি নিয়েই হুলুস্থূল। একেকজন একেক রকম গল্প বানাতে লাগলেন। সেই গল্প ছয় বছর পর এসে এই বঙ্গ মুলুকে এসে দাঁড়াল এমন—১০১ বছর বয়সে মা হয়ে গিনেস বুকে নাম লিখিয়েছেন ওই নারী। শত শত অনলাইন পোর্টাল হামলে পড়ল। কেউ একজন একটা গল্প বানাল, সেই গল্প সবাই মিলে কপি করে পেস্ট করল। ভাগ্যিস এ জন্য শর্টকাট বাটনের ব্যবস্থা করে রেখেছিল প্রযুক্তিবিদরা। ‘কন্ট্রোল সি’ ‘কন্ট্রোল ভি’ জুড়িটি না থাকলে যে কী হতো! এই সুবিধাটি নিয়ে কী কী রটল, তা আপনারা আজকের পত্রিকা ফ্যাক্টচেকে প্রকাশিত গত ১৪ জুলাইয়ের প্রতিবেদন থেকে এরই মধ্যে জেনেছেন।

নতুন পাঠকদের জন্য আবার লিখছি-ওই নারীর নাম আনাতোলিয়া ভার্তাদেলা। তিনি ইতালির অধিবাসী। কিন্তু ইউরোপে ওভ্যারি ট্রান্সপ্লান্ট (ডিম্বাশয় প্রতিস্থাপন) আইনত নিষিদ্ধ হওয়ায় তিনি তুরস্কে এই শিশুর জন্ম দেন। ছবির ওই শিশুটির আগে ওই নারী ১৬টি সন্তান জন্ম দিয়েছেন।

গুজব ছড়ানো প্রতিবেদনগুলোতে আলেক্সান্দ্রো পোপোলিচি বক্তব্যও নামের এক ডাক্তারের বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। পরে দেখা গেল, সেই ডাক্তারের বাস্তব অস্তিত্বই নেই। এমনকি যে গিনেস রেকর্ডের কথা বলা হয়েছে, এবং যে রেকর্ড ভাঙার কথা বলা হয়েছে, তারও কোনো অস্তিত্ব নেই।

গুজবটি কিন্তু নতুন না। গত ছয় বছরে অসংখ্যবার এই তথ্য নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা ও নাইজেরিয়াতে গুজব এমন মাত্রায় ছড়িয়েছিল যে, বার্তা সংস্থা এএফপি তাদের ইংরেজি সংস্করণে একটি ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

কিংবা ধরা যাক বিদ্যাসগরের ছবি বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিটির কথা। এই ছবির বয়স তো আরও বেশি। ছবিটির উৎস খুঁজে অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তো দূরের কথা নিদেন পক্ষে বাঙালি বলেও নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, এই ছবি জনপ্রিয় রুশ লেখক ও সাংবাদিক ভি এম দারোশেভিচের লেখা বই  ‘ইস্ট অ্যান্ড ওয়ার’-এর ১১৩ নম্বর পৃষ্ঠায় ছাপানো হয়েছিল। ক্যাপশনে সুস্পষ্টভাবে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র–এর কথা উল্লেখ আছে। অথচ কী অবলীলায় এই ছবি বিদ্যাসাগরের বলে প্রচার করা হচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটা প্রেমের লক্ষণ!
শেষ উদাহরণটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের স্বাভাবিক কিছু প্রবণতা। মানুষ সৃষ্টির শুরু থেকেই তার অস্তিত্ব নিয়ে শঙ্কায় ভুগেছে। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা নিয়ে তার ভাবনা বা দুর্ভাবনার সঙ্গে তেমন পার্থক্য নেই অন্য প্রাণীর। এটা প্রাণের ধর্ম। ফলে ধ্বংস নিয়ে তার ভাবনা আসবেই। ফলে এমন নানা কল্পিত শঙ্কার গুজব কিছুদিন পরপরই আমাদের সামনে আসছে।

বিদ্যাসাগর সম্পর্কিত গুজবটি কিছুটা নির্দোষ প্রকৃতির, যেখানে বিদ্যাসাগরের প্রতি বাঙালির তীব্র আকর্ষণেরই প্রমাণ বহন করে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে এই আকষৃণের অন্ধতা নিয়ে। এখানকার মানুষ সাধারণত যাকে ভালোবাসে, তাকে সর্বান্তকরণে ভালোবাসে। আর সেই সূত্রে করে বাড়াবাড়িও। পছন্দের মানুষের ওপর মহত্ব আরোপে আমাদের জুড়ি মেলা ভার। আর এই মহত্ব আরোপ করতে গিয়েই তারা ভুলে গেছে বিদ্যাসাগরের ব্যক্তিক ইতিহাসে আরও বেশি ক্লেশ জুড়ে না দিলেও তিনি মহৎ–ই থাকেন।

আর প্রথম উদাহরণটিও আপাতদৃষ্টে নির্দোষ। তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা হলো এই গুজবগুলো যখন একমাত্র সত্য হিসেবে উপস্থাপন করে একে নানা উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে এসব গুজবের সামাজিক প্রভাব কখনো কখনো ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কিন্তু এতে কে থোড়াই কেয়ার করে?

এ দেশের নেট দুনিয়ার মাস্তানেরা ইচ্ছামতো গল্প বানাচ্ছে। অনলাইন সংবাদমাধ্যমের আদলে ইচ্ছেমতো ওয়েব প্ল্যাটফর্ম খুলে সেই গল্প কপি-পেস্ট করে প্রকাশ করছে। আবাল–বৃদ্ধ–বনিতা সেই গল্প বিশ্বাস করে নিমেষেই শেয়ার করছে। কেউবা অতি উৎসাহী হয়ে মেসেঞ্জারে পাঠিয়ে দিচ্ছে, যেন বিরাট একটা অজানা জানিয়ে বড্ড উপকার করে ফেলল। ভাইরাল আর শেয়ারের এই যে নেশা, নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে এর ফল কী হবে, কেউ ভেবে দেখছেন?

সিটিজেন আর নেটিজেনের পার্থক্য না বুঝতেই সবার হাতে ইন্টারনেট এসেছে। এর ভালো দিক আছে, খারাপ দিকগুলো নিয়েও ভাবা দরকার। গভীর ভাবনার দরকার।

এবার একই প্রসঙ্গে একটু অন্য দৃষ্টিতে তাকানো যাক। প্রথম যে গুজবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তার দিকে তাকালে দেখা যাবে—গুজবটি পাশ্চাত্যে ছড়িয়েছিল ছয় বছর আগে। বঙ্গ মুলুকে আসতে এর সময় লেগেছে ছয় বছর। অলস বলে দুর্নাম কামানো বঙ্গসন্তানদের গুজব ছড়াতেও একটু সময় লাগছে বৈ কি! একে ইতি–নেতি দুভাবেই নেওয়া যায়। ইতি—গুজবটি দেরিতে ছড়াচ্ছে। আর নেতি—গুজব ছড়াচ্ছে।


চ্যানেল ৭৮৬ এর নিউজ রুম এ যোগাযোগ করতে ই মেইল করুন এই ঠিকানায় [email protected] । আপনার পন্য বা সেবার প্রচারে বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য কল করুন +1 (718) 355-9232 এই নাম্বারে।

সংবাদটি শেয়ার করুনঃ