Channel 786 | চ্যানেল ৭৮৬ | Community Bangla Newspaper

বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের পথপ্রদর্শক মামুন

নিজস্ব প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৯:২৯, ২৯ আগস্ট ২০২১

বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের পথপ্রদর্শক মামুন

মা-বাবার ইচ্ছা ছিল ছেলেকে মাদ্রাসায় পড়াবেন। হলোও তাই। খুলনা আলিয়া মাদ্রাসায় দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর অদ্ভুত কারণে মাদ্রাসা জীবনের ইতি ঘটে। মাদ্রাসার হোস্টেলে চার দেয়ালের মধ্যে থাকার কারণে শৈশবটাও কেটেছে বেশ সাদামাটা। গ্রামের কিশোরদের সঙ্গে দল বেধে ঘুড়ি ওড়ানো কিংবা ক্রিকেট, মার্বেল বা অন্য কোনো খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ ছিল বেশ কম। মাদ্রাসার ছাত্র বললে হলেও ব্যতিক্রমী ছেলে ছিলেন মামুন রশিদ।

মামুন রশিদের জন্ম খুলনায়। বিজ্ঞানের প্রতি ছিল তাঁর বেশ আগ্রহ। নিজ ইচ্ছায় শৈশবে বিভিন্ন বিজ্ঞান মেলায় অংশগ্রহণ করেন। বর্তমানে পেশায় একজন শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই শিক্ষকতা বেশ উপভোগ করতেন। উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গ্র্যাজুয়েট রেকর্ড এক্সামিনেশন বা জিআরই পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্য বাইরে পড়তে যাওয়ার স্বপ্ন অনেকটা নির্ভর করে এ পরীক্ষার ওপর। উচ্চশিক্ষার্থে বাইরে পড়তে যাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে চলেছেন মামুন রশিদ। বাংলা ভাষায় জিআরইর প্রথম ব্লগ প্রতিষ্ঠাতা তিনি। শুধু ব্লগ প্রতিষ্ঠা নয় নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন জিআরইর প্রস্তুতি নেওয়ার প্রতিষ্ঠানও।

 

গ্র্যাজুয়েট রিসোর্সেস এনহেন্সিং সেন্টার বা গ্রেকের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করে চলেছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রে বসেও ঢাকা এবং চট্টগ্রামে এ প্রতিষ্ঠানের চারটি শাখা নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। এ ছাড়া ফেসবুকে লাইভ প্রোগ্রামে বিভিন্ন অতিথিদের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার ব্যবস্থা করেন মামুন।

১৯৯৭ সালে ফরিদপুর জেলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও ১৯৯৯ সালে নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করেন মামুন। এরপর বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন। ইচ্ছা ছিল তড়িৎ কৌশলে পড়ার। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষার রোল অনুযায়ী পছন্দের বিষয়ে পড়ার সুযোগ হয়নি। ভর্তি হওয়ার পর আশপাশের অনেকেই পরামর্শ দেন সিভিলে পড়ে ভবিষ্যতে ভালো চাকরি পাওয়া এবং উচ্চশিক্ষার জন্য বাইরে পড়তে যাওয়া কষ্টসাধ্য হবে। কার্জন হলের সৌন্দর্য আর টিএসসিতে শিক্ষার্থীদের প্রাণখোলা আনন্দ, কবিতা আর গানের রিহার্সাল এগুলো তাঁকে সে সময় ব্যাপক প্রভাবিত করেছিল। তাই শেষ পর্যন্ত বুয়েটে ভর্তি বাতিল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগে ভর্তি হন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষেই একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ইনফরমেশন টেকনোলজির (আইটি) ওপর তিন বছরের ডিপ্লোমা করার জন্য বৃত্তি পান। কম্পিউটার বিজ্ঞানের আগ্রহ থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি তিনি তিন বছর আইটির ওপর ডিপ্লোমাও সম্পন্ন করেন।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে থাকার সময় থেকেই টিউশনি শুরু করেন। অল্প কয়েক দিনের মধ্যে আবিষ্কার করেন ছাত্র-ছাত্রী পড়ানোর ব্যাপারটা খুবই উপভোগ করছেন। চারুপাঠ কোচিং সেন্টারে রসায়ন পড়ানোর মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের কাছেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন মামুন। একদিকে ফার্মেসি ও আইটির ক্লাস অন্যদিকে টিউশনি এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন বেশ ব্যস্ততায় কাটে তাঁর। বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেন। অল্প দিনেই স্বাবলম্বী হওয়ার কারণে পরিবার চালাতেও সক্ষম হন তিনি।

২০০৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসে ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটিং পদে চাকরিতে যোগ দেন। একই সঙ্গে টিউশনিও করতে থাকেন। কিন্তু চাকরিতে যোগদানের পর কাজের কোনো স্পৃহা পাচ্ছিলেন না। সব সময়ই নিত্য নতুন চিন্তা আর জটিল সমস্যার সমাধানে বুঁদ থাকতে পছন্দ করতেন মামুন।

মামুন রশিদের জীবন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ওমর ফারুক খান অনেকটা আলাদিনের চেরাগের মতো বদলে দেন। ইয়াহু মেসেঞ্জারে অধ্যাপক ফারুক খানের সঙ্গে চাকরিতে বিরক্তির কথা নিয়ে আলাপ করছিলেন। একপর্যায়ে তিনি তাঁকে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র আসার পরামর্শ দেন। ‘আমেরিকায় আসার জন্য জিআরই লাগে, টাকা লাগে না’—এই একটি কথাই তাঁর জীবনে আমূল পরিবর্তন আনে। তাঁর মনে বিশ্বাস জন্মায়, তাঁর পক্ষেও উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকায় পড়তে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু এ বিষয়ে তাঁর কোনো ধারণাই ছিল না। দেরি না করে নীলক্ষেত থেকে জিআরইর বিভিন্ন বই কিনে প্রস্তুতি শুরু করেন। জিআরই পরীক্ষা দিয়ে আমেরিকার পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করার পর পাঁচটি থেকেই তাঁর আবেদন নাকচ করে দেওয়া হয়।

ব্রাজিলিয়ান দার্শনিক চিকো জাভিয়ার বলেছিলেন, প্রত্যেকের জীবনের একটা গল্প আছে। অতীতে ফিরে গিয়ে গল্পের শুরুটা কখনো পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, কিন্তু কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তুমি গল্পের শেষটা চাইলেই নতুন করে সাজিয়ে তুলতে পারো।

হাল না ছেড়ে নিজের লক্ষ্য পূরণে অবিচল ছিলেন বলেই মামুন রশিদ আজ নিজের স্বপ্ন পূরণের গল্প বলতে পারছেন। উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকায় যেতেই হবে-নিজের মধ্যে এ রকম জেদ চেপে বসেছিল। তাই পরেরবার আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেন। এবারেও আটটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁর আবেদন নাকচ করে দেওয়া হয়। পরে হঠাৎ করেই টেক্সাস টেক ইউনিভার্সিটি থেকে তাঁর ভর্তির সুযোগ আসে। ব্যর্থতায় ভেঙে না পড়ে যারা লক্ষ্য পূরণে অবিচল থাকেন তাঁদের জন্য বিধাতা হয়তো ভাগ্যের দরজা এমনি করেই খুলে দেন। ২০০৮ সালের আগস্ট মাসে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান স্বপ্নের দেশ আমেরিকায়। ২০১৩ সালে নিউরোসায়েন্সের ওপর পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তারপর ২০১৫ সালে ভার্জিনিয়ার এপালাশিয়ান কলেজ অব ফার্মেসি থেকে পোস্টডক সম্পন্ন করে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন। ২০২০ সাল পর্যন্ত এখানে শিক্ষকতা করে বর্তমানে মায়ামির লারকিন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মাঝে উচ্চশিক্ষার জন্য বাইরে পড়তে যাওয়ার আগ্রহ দিনে দিনে বাড়ছে। কিন্তু আগ্রহ থাকলেই কী সব সম্ভব হয়? এ জন্য পার হতে হয় জিআরই, টোফেল পরীক্ষার মতো কঠিন বৈতরণি। তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব ঘটা এবং বাংলাদেশে ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ার আগে উচ্চশিক্ষার্থে বাইরে পড়তে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন তথ্য সহজেই পাওয়া যেত না। তাই ইচ্ছা থাকার পরেও অনেক শিক্ষার্থী জানার অভাব এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ না করায় বাইরে পড়তে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারেনি। এ বিষয়টি মামুন রশিদকে খুব ভাবিয়ে তোলে। নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝতে পেরেছেন শুধুমাত্র জিআরই সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা কতটা পিছিয়ে পড়ছে। তাই টেক্সাস স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ভর্তির সুযোগ আসার আগে চিন্তা করতে লাগলেন, শিক্ষার্থীদের জিআরইর প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য কিছু একটা করতে হবে। যেই ভাবা সেই কাজ। পত্র-পত্রিকায় ‘জিআরই পড়াতে চাই’ বলে বিজ্ঞাপন দিতে শুরু করলেন। কিন্তু কোনো সাড়া না পেয়ে বেশ নিরাশই হলেন। তারপর বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে দৌড়াদৌড়ি করে অবশেষে সাইফুর’স এ পড়ানো শুরু করেন। মাঝে ধানমন্ডিতে জিইডি সেন্টারের সঙ্গে ১০ বছরের চুক্তি করেন। কিন্তু সেখানকার কর্মকর্তারা চুক্তি ভঙ্গ করায় জিআরইর প্রস্তুতির জন্য নিজের একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানোর জেদ চেপে বসে। ঢাকার লালমাটিয়ায় জিআরই সেন্টার নামে এর কার্যক্রমও শুরু করে দেন। ওয়েবসাইট বানানো, প্রতিষ্ঠানের লিফলেট বানানো, লেকচার বানানো সব কাজ নিজ হাতেই সামাল দেন যুক্তরাষ্ট্রে বসেই।

 

প্রতিষ্ঠান দেখাশোনা করার গুরুদায়িত্ব পড়ে বোন বিলকিস জাহানের ওপর। কিন্তু প্রতিষ্ঠান শুরুর পাঁচ মাস পরেও তেমন কোনো শিক্ষার্থীই আসেনি। ব্যর্থতার কাছে কখনো তিনি মাথা নত করেননি। ধীরে ধীরে তাঁর প্রতিষ্ঠানটি সাফল্যের মুখ দেখতে শুরু করে। ২০১০ সালে বনানীতে দ্বিতীয় শাখার পর সায়েন্স ল্যাবে তৃতীয় শাখার উদ্বোধন করেন। ২০১৫ সালে লালমাটিয়ার ছোট শাখাটাকেই বড় আকারে শুরু করেন।

তারপর ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামে প্রথম শাখার উদ্বোধন করা হয়। নানা বাধা-বিপত্তির পরেও তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত করার পেছনে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ায় এখন শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্বপ্ন পূরণে এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আলো দেখতে পাচ্ছেন। উচ্চশিক্ষার্থে বাইরে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন পূরণের কারিগর হিসেবে কাজ করে চলেছেন মামুন রশিদ।

নিজের জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে সব সময়ই সচেতন ছিলেন মামুন রশিদ। তাই বারবার ব্যর্থতার পরেও কখনো নিজের লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি। উচ্চশিক্ষার্থে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়বে এমনটাই প্রত্যাশা করেন তিনি।


 চ্যানেল ৭৮৬ এর নিউজ রুম এ যোগাযোগ করতে ই মেইল করুন এই ঠিকানায় [email protected] । আপনার পন্য বা সেবার প্রচারে বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য কল করুন +1 (718) 355-9232 এই নাম্বারে।

সংবাদটি শেয়ার করুনঃ